হিমাদ্রি মুখার্জী

যাক বাবা আর তো এক মাস সাতাশ দিন। দাঁতে দাঁত চেপে কাটিয়ে দিলে সুখের পোয়াবারো। মোট 7404.00 টাকা এল বলে, সেই বাকি দক্ষিণা। ধৈর্য পরম গুণ, যখন সয়েছেন আর প্রায় দু’মাস মোটে। ওই যে ফোন করার পর এ্যাংরা ম্যাংরা করে বলা তারপর ইংরেজিতে This numbers does not exist . Check the number please .

ঠিক তিন মাসের মাথায় একটা সুদৃশ্য খাম রেজিস্ট্রি হয়ে এল পুরোত ঠাকুরের নাম ঠিকানায়। খামটা মোটা লাগছে, পাঁচশ টাকার নোট হলে চৌদ্দ খানা, দু’হাজার সাথে থাকলে পাঁচশ এর নোট নিয়ে পাঁচ খানা। ওরকম মোটা লাগছে। রসিদে সই করে খামটা নিয়ে একটু শুঁকলেন। বাঃ টাকার গন্ধে ফুরফুরে লাগছে মনটা। গিন্নী হাঁক ডাক শুনে রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে বেরিয়ে এলেন, ঠাকুর মশাই এর হাতে মোটা খাম দেখে আনন্দে গদ গদ। পুরোত মশাই ভাবলেন, ” না, আর যাই হোক মেয়েটা উকিল বাবু আর তার স্ত্রীর মত স্তোকবাজ নয়, কথা রাখতে জানে।”

অবশেষে খামের মুখ খুূব সাবধানে খুলতে লাগলেন যদি হাতের টানে নোট ছিঁড়ে যায়, একটু খুলছেন আর দেখছেন। বেঁটে খাটো পুরোত গিন্নী পায়ের আঙুলের উপর ভর করে ঠাকুর মশাই এর হাতের ফাঁক গলিয়ে দেখছেন। বেরিয়ে এল তিন পাতার ভাঁজ করা কাগজ, ভেতরে টাকা নেই। বিরাট বড় চিঠি, প্রথমে লেখা। …….

পূজ্যপাদ পুরোহিত মহাশয়,
শত সহস্র প্রণাম পূর্বক নিবেদন ……. দিয়ে শুরু আর সমাপ্তিতে …… আপনার আশীর্বাদ ধন্য….।
না কোন কাব্য নেই, সোজা সরল করে লেখা, তবে বিনীত। মোদ্দা কথা আরো দু’মাস আর আট কর্ম দিবস সময় চাই। কেননা বাড়ির রান্নার বউ অসুস্থ হয়ে ছুটি নেওয়ায় একজন অস্থায়ী রাধুঁনি দ্বিগুণ মাইনে দিয়ে রাখতে গিয়ে টাকাটা বেরিয়ে গেছে। নচেত্ ……. ইত্যাদি ইত্যাদি। পুরোত মশাই চিন্তিত হ’লে ও কিছুটা আশ্বস্ত, উকিল বাবুর মত পাওনা গন্ডা নিয়ে চুপচাপ থাকে নি। দ্বিতীয়তঃ তিন মাসের বদলে মেয়াদ কমে দুই মাস আট দিনে এসে ঠেকেছে। গিন্নী কে চিঠি পড়িয়ে শোনাতে…” ঝ্যাঁটা মারি আবাগীর কপালে। তখন পঁই পঁই করে বলেছিলাম উকিল বাবুর পূজা ক্ষ্যামা দেও , শুনলে না। এখন আবার ঢং করে সময় নেওয়া। এরা সব কুহকিনী ডাকিনী। আচ্ছা সত্য করে বলত উকিল বাবুর বউ দেখতে শুনতে কেমন ? নির্ঘাত তোমার মনে ধরেছে, তাই ম্যাদা মেরে পড়ে আছ, ট্যাঁ ফোঁ করছ না।”

পুরোত মশাই মরমে মরে গেলেন, স্বপ্নেও ভাবেন নি অর্ধাঙ্গিনীর কাছ থেকে অমন অনাসৃষ্টি র কথা শুনবেন। তিনি টাকে হাত বোলাতে লাগলেন। চিঠির একটা অংশে খটকা লেগেছে ” দুই মাস আর আট কর্ম দিবস !” মানে ছুটির দিন বাদ দিয়ে অর্থাত ছুটির দিন নিয়ে তিন মাস। ও হরি, উকিলের পুত্র বধূ বলে কথা ! কি আর করেন, পেটে কিল মেরে অপেক্ষা করা ছাড়া পথ কই ?

কিছুদিন যেতে পুরোত মশাই আচমকা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বাড়ির পূজো করতে বসে হঠাৎ অচৈতন্য। তিনি আগেই গিন্নী কে উকিল বাবুর ফোন নাম্বার দিয়ে বলে রেখে ছিলেন বিপদে আপদে তাঁকে ফোন করতে।

সাতপাঁচ নানা কথা ভেবে তিনি উকিল বাবুকে সব জানালেন। উকিল বাবু সবে হাত মুখ ধূয়ে ড্রয়িং রুমে বসে জম্পেশ করে এক পেগ টানছিলেন ধীরে সুস্থে।খবর পেয়ে তড়িঘড়ি সহকারীকে ডেকে নিয়ে পুরোত ঠাকুরের বাড়ি হাজির। এম্বুল্যান্স ডেকে পুরোত মশাই কে নিয়ে সোজা নার্সিং হোম। উকিল বাবুর পরিচিতির জন্য তাড়া তাড়ি চিকিত্সা শুরু হল।

আধ ঘন্টার মধ্যে ওনার জ্ঞান ফিরে এল। ডাক্তার বাবুরা বললেন, ” মনে হয় ভয়ের কিছু নেই। তবু সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হবে।”
পুরোত গিন্নী ঠাকুর মশাই কে ছেড়ে বাড়ি ফিরতে রাজি নন । উকিল বাবু এবং সহকারী অনেক বুঝিয়ে হাতে পাঁচশ টাকার দশ খানা নোট দিয়ে বাড়ি পৌঁছে ফিরে গেলেন।

মনে পড়ল পুরোত ঠাকুরের চার চারটা পূজোর দক্ষিণা বাকি।ওটা কাল ওনার হাতে দিয়ে দেবেন। ওনার যদি কিছু হয়ে যায় নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন না। ব্যাপারটা এমনি তে খারাপ হয়ে আছে, যাক ভুল শুধরে নেবেন।
পরদিন ছুটির দুপুর বেলা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে ছুটলেন নার্সিং হোমে। অবশ্য সকালে ফোন করে পুরোত ঠাকুরের স্বাস্থ্য ও অবস্থার খবর নিয়েছেন।

আজ আর ভুল করলেন না, মোট সাত হাজার একশ টাকা খামে করে নিয়ে এলেন। ভিজিটিং আওয়ারে গল্প করলেন বসে, পুরোত গিন্নী ও এসেছেন। ঠাকুর মশাই ভাল, শরীর টা দুর্বল। কথায় কথায় ভিজিটিং আওয়ার শেষ, পুরোত গিন্নী সময় মত বেরিয়ে পড়লেন। উকিল বাবুর মনে পড়ল টাকা দেওয়া হয় নি। পকেট থেকে খাম বের করে পুরোত ঠাকুরের হাতে দিয়ে বললেন , ” ঠাকুর মশাই, আপনার পাওনা টাকাটা। ”
পুরোত মশাই যারপরনাই খুশী হয়ে হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখছেন খাম টা। এর মধ্যে ডাক্তার আর সহযোগী রা ঢুকে পড়েছেন। তাদের দেখে উকিল বাবু বসা থেকে উঠে ঠাকুর মশাই এর হাত থেকে খাম টা নিলেন এবং বললেন, ” এখন এটা আমার কাছে থাকুক, ডাক্তার বাবুরা এসে পড়েছেন। পরে আপনাকে দেব।” তারপর বেরিয়ে গেলেন।

পুরোত মশাই ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না, কেনই বা দিলেন আর কেনই বা নিলেন।
নার্সিং হোম থেকে উকিল বাবু হালকা মন নিয়ে বেরুলেন, টাকাটা পুরোত মশাই কে দিয়ে ও ফিরিয়ে এনেছেন নিরাপত্তার স্বার্থে। এটা এখন ওর কাছে থাকবে এবং কাল ছুটির সময় পুরোত মশাই কে দেবেন ই। ইতিমধ্যে হাসপাতালের খরচ 85000 /- টাকার চেক দিয়ে দিয়েছেন।
পথে বার দেখে ঢুকে পড়লেন, কতক্ষণ ছিলেন বলতে পারবেন না। বন্ধ হবার মুখে বেরিয়ে পড়লেন, বেশ বেসামাল অবস্থা। পকেটে যা ছিল উড়িয়ে দিয়েছেন, এমন কি খামে রাখা টাকাটা ও। পা ঠিকমত পড়ছে না। রাস্তায় নামতে আলোর ঝলকানি, চোখ বুঁজে ফেললেন, তারপর একটা ক্যাচ শব্দ।

পরদিন এগারোটা নাগাদ ছুটি পেয়ে পুরোত মশাই বেড থেকে নেমে হেঁটে এগুলেন। নার্স যত্ন করে এগিয়ে দিল, কেউ কোন টাকা চাইল না। বুঝলেন উকিল বাবু টাকা দিয়ে দিয়েছেন।
বেরুবার মুখে সামনে উকিল বাবুর স্ত্রী হন্ত দন্ত হয়ে ঢুকছেন। পুরোত মশাই কে দেখে ছুটে এলেন তার কাছে, ঠাকুর মশাই এর হাত ধরে কাঁদতে লাগলেন।

পুরোত মশাই ভাবলেন, ” আহা, কি মায়া এদের,আমার মত সামান্য লোকের জন্য এত দরদ! আর আমি কিনা ! ”
পরে জানলেন গতরাত থেকে উকিল বাবু হাসপাতালে, দুর্ঘটনায় পড়েছেন শুনে খারাপ লাগল। উকিল বাবুর স্ত্রীর সাথে গিয়ে I C U তে উঁকি মেরে দেখলেন উকিল বাবুর সারা শরীরে ব্যান্ডেজ, নাকে নল। গুরুতর অবস্থা বুঝে ওখানে দরজার পাশে বসে পড়লেন। আহা অমন উপকারী লোক তাকে বাঁচাতে হবে। পূজোর বাকী দক্ষিণা নাই পেলেন। তার নিজের চিকিত্সার সব খরচ উকিল বাবুর।

বসলেন ঠাকুরের ধ্যানে, নিজের সকল পূণ্য দিয়ে ও বাঁচাবেন তাঁকে। বাহ্যজ্ঞান রহিত হয়ে এক মনে এক ধ্যানে ডাকতে লাগলেন ঠাকুর কে। নার্স তাকে সরিয়ে দিতে এসে ও কিছু বলল না। ক্ষুধা তৃষ্ণা ভুলে প্রায় সমাধি মগ্ন হয়ে কত ক্ষণ বা কত দিন ছিলেন জানেন না। হঠাৎ মনে হল একটা আলোর শিখা, কারো ডাকে জাগলেন , সামনে দেখলেন অপূর্ব সুন্দরী এক তরুণী, ” ঠাকুর মশাই উঠুন, চোখ মেলুন, বাবার জ্ঞান ফিরেছে।”

পুরোত মশাই দেখলেন একটা স্নেহের হাত তার সামনে, হাতে তার সন্দেশ আর অন্য হাতে ডাবের জল।
সে মেয়েটি আর কেউ নয় উকিল বাবুর পুত্রবধূ, সেই এ্যাংরা ম্যাংরা করে কথা বলা রাজ্যের মেয়ে টা !!

লেখাটি পাঠিয়েছেনঃ * হিমাদ্রি মুখার্জী *

বি:দ্র: আমাদের প্রতিটি লেখার নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুকপেজ-এ লাইক দিন এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। আপনার মনে কোন প্রশ্ন থাকলে এবং যেকোন বিষয়ে জানতে চাইলে অথবা আপনার কোন লেখা প্রকাশ করতে চাইলে আমাদের ফেসবুক পেজ বিডি লাইফ এ যেয়ে ম্যাসেজ করতে পারেন।

ফেসবুকের হোমপেজে নিয়মিত আপডেট পেতে নিচের লাইক বাটনে ক্লিক করুন

⇒ লেখাটি ভালো লাগলে প্লিজ বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন। শেয়ার করতে √ এখানে ক্লিক করুন

আপনার ফেসবুক একাউন্ট থেকে খুব সহজেই কমেন্ট করুন

মন্তব্য করুনঃ

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন

1 × four =