Romance

জন্মনিয়ন্ত্রণ করার প্রধান তিনটি উপায় আমরা এর আগের পর্বে আলোচনা করেছি। ওই তিনটি উপায় মোটামুটি সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য এবং সবথেকে জনপ্রিয়। তবে সম্পূর্ণতার স্বার্থে গর্ভসঞ্চার রোধ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের আরও কয়েকটি পদ্ধতি সম্মন্ধে আজকের পর্বে আলোচনা করছি। উল্লেখ্য যে জন্মনিয়ন্ত্রণের সমস্ত উপায়ের মধ্যে কেবল কন্ডোমই জন্মনিয়ন্ত্রণের সাথে সাথে যৌনরোগের হাত থেকেও সুরক্ষা প্রদান করে। তাই যেকোন ধরনের যৌনক্রিয়ার সময় কন্ডোম ব্যবহার করাই সবথেকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য।

১. ইমার্জেন্সি গর্ভনিরোধ পিল (emergency contraceptive pill): প্রথমেই বলব এই পিল কেবল আপৎকালীন পরিস্থিতিতে মহিলাদের ব্যবহারের জন্যই তৈরি। যেমন উত্তেজনার বশে কন্ডোম বা অন্য কোন গর্ভসঞ্চারের উপায় ব্যবহার না করে যৌনসঙ্গম করে ফেললে বা নিয়মিত সাধারণ জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেতে ভুলে গেলে বা যৌনসঙ্গমের সময় কন্ডোম ফেটে গেলে কিংবা বলপূর্বক যৌনসঙ্গমের শিকার হলে তার পর যত দ্রুত সম্ভব (বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যেই) ইমার্জেন্সি গর্ভনিরোধ বড়ি খেতে হয়। যৌনসঙ্গম ও এই পিল খাওয়ার মাঝে সময়ের ব্যবধান যত বাড়বে এই বড়ির গর্ভসঞ্চার রোধ করার ক্ষমতাও ততই কমে যায়। এই পিল বা বড়িকে মর্নিং আফটার পিল-ও বলা হয়, যার মানে সঙ্গম রাতে হয়ে থাকলে সকালে উঠে প্রথমেই এই পিল খেতে হয়। তবে সকালের জন্য অপেক্ষা না করে যত দ্রুত সম্ভব এই বড়ি খাওয়াটাই শ্রেয়। আপনার মাসিকের কত নম্বর দিন চলছে এবং সঙ্গমের কতক্ষণ পরে খাওয়া হয়েছে তার উপর নির্ভর করে ইমার্জেন্সি গর্ভনিরোধ বড়ি ডিম্বাণু নির্গমনে সামায়িক বাধা দিয়ে, কিংবা নিষেক প্রতিহত করে, এমনকি নিষেক হয়ে থাকলে জরায়ুতে নিষিক্ত ভ্রূণের স্থাপন প্রতিহত করে গর্ভসঞ্চার রোধ করে। তবে আবারও বলছি এই বড়ি কেবল ইমার্জেন্সি বা আপৎকালীন পরিস্থিতিতেই ব্যবহার করা উচিৎ। নিয়মিত ইমার্জেন্সি পিল ব্যবহার করলে জননতন্ত্র ও শরীরের প্রভূত ক্ষতি সাধিত হয়। যেকোন ঔষধের দোকানেই ইমার্জেন্সি পিল পাওয়া যায়। আপৎকালে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করলে প্রায় ৯০% ক্ষেত্রে ইমার্জেন্সি পিল গর্ভসঞ্চার রোধ করতে সক্ষম হয়। ইমার্জেন্সি পিলের রাসায়নিক উপাদান হল levonorgestrel। বলে রাখা প্রয়োজন যৌনসঙ্গমের আগেই এই পিল খেয়ে নিলে কোন লাভ নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইমার্জেন্সি পিল ব্যবহার করা উচিৎ নয় – যেমন গর্ভাবস্থায়, বা ইমার্জেন্সি পিলের প্রতি এলার্জি থাকলে, যৌনাঙ্গ থেকে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হয়ে থাকলে বা আপনার ওজন ৭৬ কেজির বেশি হলে। এইসকল ক্ষেত্রে অসুরক্ষিত সঙ্গম হয়ে থাকলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। ইমার্জেন্সি পিলের কয়েকটি পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হল বমি বমি ভাব, মাথা ঘোড়া, ক্লান্তি, তলপেটে ব্যাথা, যৌনাঙ্গ থেকে স্রাব ইত্যাদি। এই পিল খাওয়ার পরবর্তি পিরিওড স্বাভাবিক সময়ের থেকে ত্বরান্বিত বা বিলম্বিত হতে পারে। কিন্তু পিরিওড যদি খুব বেশি দেরি হচ্ছে মনে হয় তবে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করিয়ে নেওয়া উচিৎ।

২. ইনট্রাইউটেরাইন ডিভাইস (Intrauterine device-IUD): দীর্ঘস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণের একটি অন্যতম উপায় ইনট্রাইউটেরাইন ডিভাইস (আই.ইউ.ডি.)। ইনট্রাইউটেরাইন ডিভাইস মূলত একটি ছোট্ট বস্তু যা জরায়ুতে স্থাপিত করা হয়। একবার জরায়ুতে বসানোর পর প্রায় তিন থেকে দশ বছর পর্যন্ত এটা গর্ভসঞ্চার রোধ করতে পারে। প্রধানত দুধরনের IUD পাওয়া যায় – কপার আই.ইউ.ডি এবং হরমোনযুক্ত আই.ইউ.ডি.। জন্মনিয়ন্ত্রন করাতে দুটোই সমান কার্যকরী। হরমোনযুক্ত আই.ইউ.ডি. -র একটি সুবিধা হল যে এটা ব্যবহার করতে থাকলে ক্রমে পিরিওডের সময় তলপেটে ব্যাথা, ক্র্যাম্প ও রজঃস্রাব কম হয়। তবে হরমোনবিশিষ্ট ইনট্রাইউটেরাইন ডিভাইসের অল্প-স্বল্প কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াও হতে পারে, যেমন মেজাজের আকস্মিক পরিবর্তন, স্পটিং ইত্যাদি। অপরপক্ষে কপার ইনট্রাইউটেরাইন ডিভাইস ব্যবহার করলে সাধারণত পিরিওডের রক্তক্ষরণ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইনট্রাইউটেরাইন ডিভাইসের সবথেকে বড় সুবিধে হল একবার লাগিয়ে নেওয়ার পর দীর্ঘদিন নিশ্চিন্ত থাকা যায়। যদি মাঝে কোন সময় গর্ভবতি হতে ইচ্ছে হয় তবে ডিভাইস খুলে নিলেই হল। উল্লেখ্য যে জন্মনিয়ন্ত্রণ করার একটি অন্যতম জনপ্রিয় উপায় হল ইনট্রাইউটেরাইন ডিভাইস। সারা পৃথিবীতে প্রায় ১৮ কোটি মহিলা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। ইনট্রাইউটেরাইন ডিভাইস লাগানোর পর প্রথম বছরে সফলতার হার প্রায় ৯৯ শতাংশ। স্তন্যদাত্রী মহিলা, বয়সন্ধিতে পৌছানো যুবতি, এখনো সন্তান হয়নি এমন নারী, এমনকি সদ্য সন্তান প্রসব করেছেন এমন মহিলারাও নিরাপদে ইনট্রাইউটেরাইন ডিভাইস ব্যবহার করতে পারেন। তবে কিছু কিছু মহিলার ক্ষেত্রে আই.ইউ.ডি. লাগানোর পর ব্যাথা হতে পারে। ইনট্রাইউটেরাইন ডিভাইস লাগাতে হলে আপনার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। নিজের হাতে এটা জরায়ুতে স্থাপন করা সম্ভব নয়। ডাক্তার বা নার্সের সাহায্য অপরিহার্য।

৩. চিরস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ (Permanent birth control): স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ছোট সার্জারীর মাধ্যমে চিরস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্ভব। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই অপারেশনের নাম ভ্যাসেকটমি ও মহিলাদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির পোশাকি নাম টিউবাল লাইগেশন বা শুধুই লাইগেশন। ভ্যাসেকটমিতে পুরুষের ভ্যাস ডিফারেন্স (শুক্রাণু বহনকারী নালী) কেটে বা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার ফলে শুক্রাশয় থেকে শুক্রাণু বেরিয়ে বীর্যের সাথে মিশতে পারেনা। ফলস্বরূপ বীর্যস্খলণে নির্গত বীর্যে আর কোন শুক্রাণু থাকেনা। তবে এর ফলে যৌন উত্তেজনা, অর্গ্যাজম, যৌনসঙ্গম এবং বীর্যস্খলনে কোন অসুবিধা হয় না। শুধু নির্গত বীর্যে শুক্রাণু থাকে না। মহিলাদের লাইগেশনের ক্ষেত্রে ফ্যালোপিয়ান নল (যা ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু জরায়ুতে নিয়ে যায়) কেটে বা বেধে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ যৌনাঙ্গে শুক্রাণু প্রবেশ করেলেও ডিম্বাণুর অভাবে নিষেক সম্ভব হয় না। জন্মনিয়ন্ত্রণ করার অন্যান্য উপায়সমূহের তুলনায় এই দুটি পদ্ধতিই অপেক্ষাকৃত জটিল, ব্যায়সাপেক্ষ এবং চিরস্থায়ী।

নিজের ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করে নিন গর্ভনিরোধের কোন উপায় আপনার জন্য একেবারে আদর্শ এবং সেইমত ব্যবস্থা নিন। জন্মনিয়ন্ত্রণ আমাদের নিজেদের পরিবার এবং দেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অন্যথায় খাদ্য ও বাসস্থানের অভাবে মানবজাতির ভবিষ্যৎ সংকটাপন্ন হতে বাধ্য। ভালো থাকুন ও উপযুক্ত সুরক্ষা নিয়ে যৌন আনন্দ উপভোগ করুন।

আরও পড়ুন: জন্মনিয়ন্ত্রণ (গর্ভনিরোধ) করার সঠিক পদ্ধতি ও বিভিন্ন উপায় (পর্ব-১)

বি:দ্র: প্রতিটি লেখার নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুকপেজ-এ লাইক দিন এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। যেকোন বিষয়ে জানতে চাইলে এবং আপনার কোন লেখা প্রকাশ করতে চাইলে আমাদের ফেসবুক পেজ বিডি লাইফ এ যেয়ে ম্যাসেজ করতে পারেন।

খবরগুলো আপনার ফেসবুক হোমপেজে নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক করুন